দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

দেশ-বিদেশের প্রায় অর্ধলক্ষাধিক পুণ্যার্থী হাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে তিন কিলোমিটারের বেশি আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়েছেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ‘মা মারিয়া’র প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও আশীর্বাদ প্রার্থনা। ভক্তদের বিশ্বাস, মা মারিয়ার কাছে প্রার্থনা করলে মনের আশা পূরণ হয়।
‘মানবতার জননী ফাতেমা রানি মা মারিয়া’ মূলসুরে শুরু হয়েছে ২৯তম বার্ষিক তীর্থোৎসব। গারো পাহাড়ের বারোমারী সাধু লিওর ধর্মপল্লীতে আয়োজিত এ উৎসব দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ খ্রিষ্টান ধর্মীয় সমাবেশ। আজ শুক্রবার মহাখ্রিষ্টযোগের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে এবারের তীর্থোৎসব।
ধর্মপল্লী সূত্রে জানা গেছে, ১৯৪২ সালে প্রায় ৪২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় বারোমারী সাধু লিওর ধর্মপল্লী। ১৯৯৮ সাল থেকে স্থানটিকে বার্ষিক তীর্থস্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। পর্তুগালের ফাতেমা নগরীর আদলে তৈরি এ ধর্মপল্লী পাহাড়ের বুকে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর অক্টোবর মাসের শেষ বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার এখানে তীর্থোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এতে শেরপুরসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহ এবং দেশ-বিদেশের পুণ্যার্থীরা অংশ নেন। উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ আলোক শোভাযাত্রা।
আয়োজক কমিটির সমন্বয়ক ও বারোমারী মিশনের ফাদার তরুণ বানোয়ারী বলেন, আবহাওয়া ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ভক্তদের উপস্থিতিও বেশি। উৎসবে আলোক শোভাযাত্রা, প্রার্থনা, নিশি জাগরণ, জীবন্ত ক্রুশের পথ ও মহাখ্রিষ্টযোগসহ নানা ধর্মীয় আয়োজন রয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান পুরোহিত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের বিশপ পনেল পল কুবি সিএসসি।
আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার পবিত্র খ্রিষ্টযোগের মধ্য দিয়ে তীর্থোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। পরে রাত ৮টায় বের হয় আলোক শোভাযাত্রা। রাত ১১টায় মা মারিয়ার মূর্তি সামনে রেখে বিশাল প্যান্ডেলে আরাধনা এবং রাত ১২টায় নিরাময় অনুষ্ঠান ও নিশি জাগরণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় প্রথম দিনের আয়োজন। শুক্রবার সকাল ৮টায় অনুষ্ঠিত হয় জীবন্ত ক্রুশের পথ। এরপর মহাখ্রিষ্টযোগের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের তীর্থোৎসব।
চট্টগ্রাম থেকে আসা তীর্থযাত্রী রিসিল মারাক বলেন, ‘আমি পরিবার নিয়ে প্রতিবছর এখানে আসি। মনের আশা পূরণ এবং অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে মা মারিয়ার কাছে প্রার্থনা করি। এতে আমাদের মনোবাসনা পূরণ হয়। গতবারের চাওয়াও পূরণ হয়েছে।’
রাজধানীর বনানী থেকে আসা কলেজশিক্ষার্থী অনন্যা ক্লোরিডা বলেন, ‘আমি রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করি। বান্ধবীদের সঙ্গে এখানে এসেছি। গতবারও এসেছিলাম। পড়াশোনা শেষ করে যেন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ভালো কিছু করতে পারি, সেই প্রার্থনা করেছি।’
ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট থেকে আসা ঘাসুড়িয়া সাংমা বলেন, ‘মা মারিয়ার কাছে এলে মনে একধরনের শান্তি পাই। আমরা এখানে প্রার্থনা করি, যেন জীবনের দুঃখ-কষ্ট দূর হয়। এখানে এসে পরিবারের জন্য কিছু কেনাকাটাও করেছি। সব মিলিয়ে বছরে একবার অনেকের সঙ্গে দেখা হয়, এটাও একটা ব্যাপার।’
ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের বিশপ পনেল পল কুবি সিএসসি বলেন, ‘আমরা ভক্তরা মা মারিয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে, ঈশ্বর-ভগবানের কাছে প্রার্থনা করলে তিনি তা পূর্ণ করেন। মানুষের চাহিদা ও প্রয়োজন তিনি পূরণ করেন। আর এআই প্রযুক্তি যেন মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়। বিশ্বে শান্তি ও সম্প্রীতি চাই।’
শেরপুরের পুলিশ সুপার একেএম জহিরুল ইসলাম বলেন, প্রায় চার শতাধিক পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদাপোশাকের পুলিশ সদস্যরাও তীর্থোৎসবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া এসআরবি, বিজিবি, আনসারসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছেন। শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠান শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের এ বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঘিরে প্রায় সাড়ে চারশ পোশাকধারী পুলিশ সদস্য সতর্কতা ও শতভাগ পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরাও নিরাপত্তা দিচ্ছেন। অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ পরিবেশে তীর্থোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এমএস/